কবিতা : ক্ষতজীবী
কবি : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল : ২২ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘ক্ষতজীবী’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
![]() |
| ক্ষতজীবী || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
ক্ষতজীবী || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
ডোবার ধারে সেই তালগাছটা আমাকে চেনে।
প্রতিদিন ভোরে, যখন কুয়াশা এখনো মাটি ছেড়ে উঠতে রাজি হয়নি, আমি তার সামনে দাঁড়াই — দুটি জীর্ণ সত্তার মতো, দুজন দুজনকে আয়না ধরে। সে দেখায় আমার ভেতরের ফাটল, আর আমি দেখি তার বুকের পচন। এই চেনাজানার কোনো ভাষা নেই, শুধু আছে এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি —
হ্যাঁ, আমরা দুজনেই ভেঙেছি। তবু আমরা দাঁড়িয়ে আছি।
আমি জানি ক্ষত কী।
ক্ষত মানে শুধু শরীরের ব্যাপার নয় — ক্ষত মানে সেই মুহূর্তগুলো যেগুলো তুমি ভুলতে চাও, অথচ ঘুমের ভেতর তারা জুতো পরে হেঁটে আসে। ক্ষত মানে সেই কথাগুলো যেগুলো কেউ একদিন বলেছিল তোমাকে — হালকা গলায়, হাসতে হাসতে — আর সেগুলো তুমি বুকের মধ্যে পেরেক হয়ে বহন করছ তারপর থেকে। ক্ষত মানে সেই সকালগুলো যখন উঠতে ইচ্ছে করে না, যখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব মনে হয়, যখন আয়নার দিকে তাকালে নিজের চোখে চোখ রাখা যায় না।
আমি সেই সব ক্ষতকে প্রতিদিন চিবিয়েছি — জাবর কাটার মতো, অভ্যাসে নয়, এক অদ্ভুত অভিশাপে। যেন ব্যথাটুকু না চিবালে আমি আর আমি থাকব না। যেন যন্ত্রণাটাই আমার একমাত্র পরিচয়।
কিন্তু সেদিন বাবুইগুলো এলো।
ছোট্ট, নির্লজ্জ, অদ্ভুত রকম আনন্দিত — তারা এলো ঠিক সেই তালগাছটার বুকে, যেখানে আমি ক্ষত ছাড়া আর কিছু দেখিনি কোনোদিন। তারা এলো এবং গান ধরল। তারা এলো এবং ডানা ঝাপটাল। তারা এলো এবং ঘর বানাল —
সেই পচা, ফাটল-ধরা, ক্ষতবিক্ষত বুকের উপরে।
আমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কতক্ষণ? জানি না। হয়তো এক মুহূর্ত। হয়তো এক জীবন।
আমি দেখলাম — ওরা ক্ষতটাকে ভয় পায়নি। ওরা ফাটলটাকে দুর্বলতা ভাবেনি। ওরা পচনটাকে পরিণতি বলে মেনে নেয়নি। বরং ওরা সেই ফাটলের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছে আশ্রয়, সেই ক্ষতের ভেতরেই বুনেছে ঘরের কাঠামো।
যেখানে আমি দেখেছিলাম ধ্বংস — ওরা দেখেছিল ভিত।
তখন বুকের ভেতর কী একটা নড়ে উঠল।
পুরনো, মরচে পড়া, দীর্ঘদিন অব্যবহারে জং ধরা — একটা বিশ্বাস, আধমরা অবস্থায় শুয়ে ছিল — সে উঠে বসল।
আমি সেদিন প্রথমবারের মতো নিজের ক্ষতগুলোর দিকে তাকালাম ঘৃণা ছাড়া।
দেখলাম — এই যে এত বছরের কষ্ট, এই যে এত রাতের একাকিত্ব, এই যে এত কথা যা গিলে ফেলেছি, এত অশ্রু যা চোখে আসেনি কিন্তু বুকের মধ্যে পাথর হয়ে জমেছে — এগুলো আমাকে শেষ করেনি।
বরং এগুলোই আমাকে নির্মাণ করেছে।
প্রতিটা ক্ষত একটা শিক্ষা।
প্রতিটা ফাটল আলো ঢোকার পথ।
প্রতিটা যন্ত্রণা একটা শিকড় — যেটা মাটির গভীরে গেছে বলেই আমি আজও দাঁড়িয়ে আছি।
আজ আমি আর ক্ষত খুঁচিয়ে দেখি না।
যন্ত্রণাকে বারবার জাগালে সে আরো গভীর হয়, আরো অন্ধকার, আরো নিজের মতো করে ছড়িয়ে যায় — এটুকু এখন বুঝি। বরং এখন আমি বসে থাকি। চুপ করে। নিজের ভেতরের সেই জায়গাগুলোর সাথে — যেগুলো একদিন ভেঙেছিল, এখন জোড়া লেগেছে একটু বাঁকা হয়ে।
জাপানিরা বলে কিন্তসুগি ; ভাঙা জিনিস সোনা দিয়ে জোড়া দাও, ভাঙার দাগটাকেই সবচেয়ে সুন্দর করে তোলো।
আমি আমার ভাঙনের দাগগুলো এখন সোনা দিয়ে জোড়া দিচ্ছি।
ধীরে। অনেক ধীরে।
কিন্তু দিচ্ছি।
ডোবার ধারে তালগাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
জীর্ণ, বৃদ্ধ, ক্ষতচিহ্নিত ;
আর তার বুকে বাবুইয়ের গান।
আমিও দাঁড়িয়ে আছি।
ভাঙা, ক্লান্ত, দীর্ঘদিনের ক্ষত বুকে নিয়ে ;
আর ভেতরে, গভীরে, কোথাও একটা ;
এক টুকরো অদম্য, একরোখা, পরাজয় না-জানা আলো।
ক্ষত থাকবে।
তবু আমি ভেঙে পড়ব না।
কারণ আমার ক্ষতের ভেতরেও!
কেউ বাসা বেঁধেছে।
কেউ গান গাইছে।
কেউ বেঁচে আছে।
— এবং সেই কেউটা আমি নিজেই।
আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন