উপন্যাস : অঘটনের প্রত্যাবর্তন
লেখক : সাইফ নাসির জিতু
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল :
রচনাকাল : ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
![]() |
| অঘটনের প্রত্যাবর্তন || সাইফ নাসির জিতু |
অঘটনের প্রত্যাবর্তন || সাইফ নাসির জিতু (পর্ব - ২)
বয়স ত্রিশ-বত্রিশ পেরিয়ে গেলেও যাদের ঠিক “মহিলা” বলা যায় না, দোলন অনেকটা তেমন মেয়ে। কিছু মানুষের দিকে তাকালেই মনে হয়, এদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা যায়। সাজগোজ, আলমারি, রান্নাঘরের বাইরেও জীবন নিয়ে যাদের নিজস্ব ভাবনা আছে, দোলন তেমনই একজন।
এই মুহূর্তে সে কিছু লেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার সিনিয়র একটু পরপরই তার কম্পিউটারের মনিটরের দিকে খেয়াল করছে। শুধু তাই নয়, কখনো জিজ্ঞেস করছে— “রোমান্টিক চিঠি নাকি?” কখনো বলছে— “কি? গল্প লিখছো নাকি?”
কারও অজ্ঞাতে মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকা, কী লিখছে সেটা দেখা যে অভদ্রতা, এই বুড়ো ভদ্রলোক তা জানে না।
দোলন যা লিখে, তা ফেসবুকেই দিয়ে দেয়। কিন্তু লেখার সময় কেউ তাকিয়ে থাকলে অস্বস্তি হয়। এমনকি দোলনের হাজবেন্ডকেও কখনো লেখা কমপ্লিট হওয়ার আগে দেখায় না।
অনেক সময় তার লেখার নেশা এতটা চেপে বসে যে অফিসের লাঞ্চ আওয়ার সংক্ষিপ্ত করে সে লেখালেখি করে। কিন্তু দোলনকে নিজের মতো থাকতে দেখলেই তাকে কিছু কাজ ধরিয়ে দেন এই লোক।
এই বৃদ্ধ বয়সেও তার দৃষ্টি শকুনের মতো। অনেক দূর থেকেই দোলনের মনিটরের লেখা পড়তে পারেন। অথচ দোলন চশমা ছাড়া নিজের মনিটরই ভালোভাবে দেখতে পারে না। দোলনের মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অতিরিক্ত ক্ষমতা, অতিস্মরণশক্তি বা অতিবিশ্লেষণী ক্ষমতা মানুষকে শয়তান করে দেয়।
অফিসে দোলনের কাজ সুনির্দিষ্ট। কাজের চাপ বেশি থাকলে ছুটির পরও কাজ শেষ করে যেতে হয়। এ সময় সিনিয়র ভাইকে বেশ তৃপ্ত দেখায়।
লেখালেখি দোলনের নেশা, তার ভালো লাগার ওষুধ, তার সময় কাটানোর সঙ্গী। আর দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করার এক বদঅভ্যাসও বলা যায়।
একসময় তুখোড় সাংবাদিক ছিল সে। “দোলনচাঁপা” নামের ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত লেখা দিত। অনেক পত্রিকায় তার ফেসবুকের লেখা মতামত আকারে ছেপে দিত।
অনেক সময় সারাদিন খাটাখাটনি করে নিউজ জোগাড় করে দেখত, সম্পাদক তার নিউজ ছাপে নি। কারণ যাদের বিরুদ্ধে নিউজ করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে সম্পাদকের সরাসরি ডিল হয়ে যেত। সেই নিউজ আর ছাপা হতো না।
দোলন তার একদিনের বেতনের বিনিময়ে সারাদিন খেটে, বিপদের ঝুঁকি নিয়ে যে সংবাদটি সংগ্রহ করত, সেই সংবাদটি থেকে লাখ টাকার বিজ্ঞাপন আদায় করে নিত পত্রিকার মালিক। এসব কারণে কোনো মিডিয়াতেই সে থিতু হতে পারেনি দোলন।
শেষমেশ নানান অঘটনের পর গণমাধ্যম থেকে সরে এসেছিল সে। স্বামীর সঙ্গে সংসার আর মিডিয়ার বাইরে ছোট একটি চাকরি নিয়ে নিজের মতো ছিলো সে। বিগত ছয়-সাত বছরে “দোলনচাঁপা” নামটা আর কেউ শোনেনি।
বাকি জীবনটা কীভাবে কাটবে, মোটামুটি ঠিক করেই ফেলেছিল সে। তার প্রিয় হাজবেন্ড আর পুতুলের মতো মেয়েটিকে সাজিয়ে-গুছিয়ে স্কুলে পাঠানো, বিকেলে ঘোরাঘুরি করা আর লেখালেখি—এই নিয়েই কাটিয়ে দেওয়ার চিন্তা ছিল।
কিন্তু হঠাৎ করেই হোয়াটসঅ্যাপে আসা একটি মেসেজ সবকিছু এলোমেলো করে দিল।
আনিসের লেখা ছোট্ট একটা মেসেজ— “আপা, জাহেদ ভাই দেশে এসেছে।”
মেসেজটি দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠেছিল দোলন। পরক্ষণেই আবার মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কী এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থায় জাহেদ রণে ভঙ্গ দিয়ে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
দোলন পাল্টা মেসেজ করল— “বাল ফেলাইতে এত দিন পর আসছে?”
আনিস লিখল— “জানিনা আপা, আমার সাথে যোগাযোগ করেছে। বলল সবার সাথে নাকি যোগাযোগ করবে।”
দোলন মনে মনে ভাবল, জাহেদের হয়তো নস্টালজিয়া পেয়েছে, সবাইকে একত্র করে কিছুদিন গল্প-গুজব করবে, তারপর আবার দেশের বাইরে চলে যাবে।
নানান কিছু ভাবতে ভাবতে সে ফিরে গেল পুরনো দিনে।
জাহেদ ছিল সত্যিকারের একজন লিডার। কিন্তু লিডার ভাবটা তাকে দেখাতে হতো না। জাহেদ হাউসে ঢুকলেই সবার মন অটোমেটিক ভালো হয়ে যেত। যার যত সমস্যা, যত কান্নাকাটি—জাহেদ এক নিমিষে ঠিক করে দিত। না। সে যেন আগে থেকেই জানত কে কী সমস্যা নিয়ে আসবে।
সারাদিনের ক্লান্তি আর জমে থাকা কাজ মুহূর্তে শেষ করার তাগিদ থাকত এই আশায় যে, জম্পেশ আড্ডা হবে। এই আড্ডার নেশায় সবাই দ্রুত কাজ শেষ করত।
কোনো সমস্যাই জাহেদের কাছে বড় ছিল হাউসে জাহেদের চেয়ে সিনিয়র আরও কয়েকজন ছিল। কিন্তু জাহেদ যা ফাইনাল করত, সেটা নিয়ে আর কেউ কিছু বলত না। সবার ভরসা ছিল ওর ওপর।
অথচ নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটার সমাধানই করতে পারেনি সে। একেবারে লেজেগোবরে হয়ে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু আজও এ নিয়ে মুখ খোলেনি।
জাহেদের এত সুন্দর ব্যক্তিত্ব কেন অবনীর সামনে ভূতলে পড়ত, কেনই বা অবনীর সামনে তাকে এত দুর্বল দেখাত—এটা আজও স্পষ্ট নয়। আসল জাহিদটাকে কখনোই দেখতে পেলো না অবনী।
দোলন আনমনে বলে উঠল—
“এই ব্যাটাকে ধরে একটা ঝাঁকুনি দিতে পারলে এখনো অনেক কিছুই করা সম্ভব।”
Follow Now Our Google News
চলবে ...
৩য় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
সাইফ নাসির জিতু’র গল্প ও উপন্যাস:
লেখক সংক্ষেপ:
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন